সাংগঠনিক স্থবিরতা ও দুর্বল প্রচারণা আওয়ামী লীগের বিপর্যয় আনতে পারে
প্রতিটি নির্বাচনের পরে সকল পত্রিকা-মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ লেখক-আলোচকরা জয়ের কারণ বিশেষত কোন দলের পরাজয়ের কারণ নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। যেমন ৯১ সালে নিজে বার বার পরাজিত হয়েও আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ নিয়ে ডঃ কামাল হোসেনের বিশ্লেষণের কথা বলা যায়। কিন্তু নির্বাচনের আগে কেন তারা এ ভবিষ্যৎ-বাণীগুলো করেন না সেটা ভাবি। মাঝে মাঝে মনে হয় পত্রিকাগুলো বোধহয় দুই দলেরই জয়-পরাজয়ের কারণগুলো ড্রাফট করে রাখে, যেটা প্রযোজ্য প্রকাশ করে।
ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাফল্য নিশ্চিত করেনা:
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর ইমেজ যেমন ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছিল, ২০০৮ এর নির্বাচনেও প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনার ইমেজই সেই নির্বাচনী ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। তবে এতে আওয়ামী লীগের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশী হয়েছে বলে আমার ধারণা কারণ জনগণ ভোট তো দিয়েছিল শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বাস্তবে নির্বাচিত নেতা হিসাবে পেয়েছে যদু-মধু-কদুকে। আর ব্যক্তির নেতৃত্বের ব্যর্থতা সবসময়ই দলকে ভোগ করতে হয়। তুলনামূলক-ভাবে সরকার পরিচালনা ও দলীয় অবস্থান বিবেচনা করলে ৯৬ এর আওয়ামী লীগ কম সংখ্যক আসনে জয়ী হলেও তাদের সাফল্যের পাল্লা অনেক ভারী ছিল এবং সেই বিবেচনায় ২০০১ এর ফলাফল ছিল অপ্রত্যাশিত।
একটি কঠিন সময় অতিবাহিত করে ২০০৮ এ যে সাফল্যের সাথে এবং যুগোপযোগী শ্লোগান নিয়ে সরকার গঠিত হয় সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ সুচিন্তিত, কৌশলী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হবে এ প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। আর সরকারের মূলভিত্তি যেহেতু দল সুতরাং দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পৃথক থাকা দলকে ঢেলে সাজিয়ে যোগ্য নেতৃত্বকে দল শক্তিশালী ও সংগঠিত করার দায়িত্ব দেয়া হবে এটাই আকাঙ্ক্ষিত ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের তিন বছর:
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে চিরাচরিত সীমাবদ্ধতা, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্য ও কৃষিজাত পণ্যের বৃদ্ধি ও খাদ্য সংকট, বিরোধীদের ষড়যন্ত্র এসব সংকট সত্ত্বেও সরকার অসফল এটা বলার কোন সুযোগ নেই। বিডিআর বিদ্রোহ সহ ড্যাপ, শেয়ার বাজারে ধ্বস, আড়িয়াল খাঁ বিলের মতো ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেভাবে বজায়ে রেখেছে তা অভাবনীয়। সরকারের সাফল্য হিসাবে দাবী করার মতো অনেক পদক্ষেপ রয়েছে:-
• বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনসহ ২০১৪ সালের মধ্যে লোডশেডিং মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ,
• কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দান,
• পরিবেশ রক্ষায় ড্যাপ এর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ ও ঢাকার পরিসর বৃদ্ধিকরণ,
• বিশ্ব-মন্দা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকারীভাবে আমদানি ও পর্যবেক্ষণ,
• জনগণের বহুল প্রত্যাশিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু ও এ মেয়াদে বিচার সম্পন্নে ব্যবস্থা গ্রহণ,
• গণতান্ত্রিক মনোভাব পোষণই নয় দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন,
• আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রতি থানায় দুজন ওসি নিয়োগ,
• গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন,
• সরকার-বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ সত্ত্বেও এ সরকারের আমলে একজন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীও চাকরীচ্যুত হয়নি,
• যানজট নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণ, ফ্লাইওভার, রিংরোড, ওয়াটার-বাস, আন্তর্জাতিক মানের বিমান বন্দর, এশিয়ান হাইওয়ের কার্যক্রমসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবস্থা গ্রহণ,
• কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ,
• চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিশেষভাবে উন্নয়ন হয়েছে,
• সর্বোপরি যে ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল তা বাস্তবায়নে সাবমেরিন ক্যাবল, ই-টেন্ডার, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সহ পাবলিক পরীক্ষাসমূহ ইন্টারনেটের অন্তর্ভুক্তি-করণ, সকল মন্ত্রণালয়, গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এমনকি প্রতিটি জেলাও ই-গভর্নেন্সের আওতায় আনা হয়েছে।
দলীয় ব্যর্থতা সরকারের সাফল্য ম্লান করে দেয়:
সরকারের যতই সাফল্য থাক দল যদি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত না থাকে তবে কখনওই জয়লাভ করা সম্ভব নয়।
- ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশী সৃষ্টি করেছে দলীয় তথা আভ্যন্তরীণ কোন্দল।
- দলীয় তেমন কোন কর্মকাণ্ড না থাকলেও এ কোন্দলের কারণ ক্ষমতা বা অর্থ-সংশ্লিষ্ট আধিপত্য বিস্তার।
- সরকারী দল হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই অনেক মৌসুমি নেতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এমনকি বিএনপিই নয় শিবির নেতাদেরও অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু প্রকৃত ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীরা বঞ্চিত হলে দলের জন্য তা বুমেরাং হয়।
- টেন্ডার-বাজী করা, ভূমি-দস্যুদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া, ব্যক্তিগত কোন্দলে দলীয় ক্ষমতার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
- প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও স্থানীয় এমপি বা নেতাদের মধ্যে চরম কোন্দল দলকে স্থবির করে রেখেছে।
- বিগত বিএনপি সরকারের আমলে অনেকে এলাকা-ছাড়াও হয়েছে। তাদের অনেকেই নিজের একটি চাকরীর সুপারিশ চেয়ে ঘুরে বেড়ায়। আবার আওয়ামী নেতার সুপারিশে ছাত্রদল নেতার চাকরী হয়েছে এমন অভিযোগও আছে।
- এবারের স্থানীয় নির্বাচনে অনেক নেতাই কেউ কোন্দলের কারণে কেউ টাকার লোভে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেনি আবার অনেকে প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করেছে।
- দল বা অঙ্গসংগঠনগুলোর সবগুলোতেই কমবেশি থাকলেও এক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ছাত্রলীগ। আগে আমরা ছাত্রলীগ করি এটা বলতে গর্ববোধ করতাম; এখন ছাত্রলীগ করতাম এটা বলতে দ্বিধান্বিত হতে হয়। ২০০৬ দুই বছরের জন্য ছাত্রলীগের সালে যে কমিটি হয় বয়সের শর্ত দিয়ে সিনিয়র অনেক অপেক্ষমাণ নেতাকে বিদায় নিতে হয়। বিদায়ী কমিটির সভাপতি নিজের আয়ত্তে রাখার জন্য জুনিয়র নেতাদের দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি করাতে সক্ষম হয়। একবারও ভাবা হয়নি ছাত্রদলের নেতারা নবগঠিত কমিটির নেতাদের পিতৃতুল্য। এমনকি জেলা, থানা বা ওয়ার্ড কমিটির নেতারাও তাদের এতদিন জুনিয়র ভাই হিসাবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে এটা ঠিক ২০১১ সালেরে প্রেক্ষাপটে বর্তমান কমিটির পরিপক্বতা এসেছে।
আওয়ামী লীগের কোন অঙ্গসংগঠনের কাউন্সিল হচ্ছেনা। কাউন্সিল ছাড়া সংগঠন যেমন প্রাণবন্ত হয়না তেমনি তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন কি করে দলের বার্তা পৌঁছে দিবে সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়।
হাইব্রিড ও প্রবীণ নেতারা:
হাইব্রিড আওয়ামী লীগ কথাটা এ দলেরই প্রচলন করা। কিন্তু একটি উদারতা আমাদের প্রবীণ নেতাদের দেখানো উচিত আর তা হল নতুন নেতৃত্ব এসেছে ঠিকই কিন্তু তাদের কারও শিকড়/রুট নিয়ে কিন্তু কোন প্রশ্ন নেই। তাদের পূর্ব ইতিহাস আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক। আবার প্রবীণ নেতাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। তারা মাঠের ও ভোটের রাজনীতি সম্পর্কে যতটা বুঝে সেটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবেনা। এই বিভক্তি-রেখা না টেনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে প্রতিচ্ছবি শেখ হাসিনা এই সীমান্তে ঐক্য প্রয়োজন।
দুর্বল প্রচারণা:
আওয়ামী লীগ বরাবরই প্রচারণায় দুর্বল। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। মিডিয়াগুলো স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সরকারের সাফল্য দলীয়ভাবে কখনও তুলে ধরতে পারেনা বা পারবে না। এটা অস্বাভাবিকও নয়। মূলত প্রচার মাধ্যমগুলোতে আমরা দুঃসংবাদই খুঁজে পাই। সুতরাং দলের সাফল্য দলকেই তুলে ধরতে হবে। দলকেই বোঝাতে হবে অন্যদলের সাথে তুলনামূলক পার্থক্য। আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষই সরকারের সাফল্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, নিজ উদ্যোগে জানাও তাদের সম্ভব নয়।
বিরোধী দল বিএনপি-জামাত জোরালো-ভাবে মাঠে-ঘাটে, সাধারণের বেশে, ইন্টারনেটে অপপ্রচার ও সরকার বিরোধী প্রচারণা চালিয়েই যাচ্ছে। তাদের কর্মকাণ্ডে সুস্পষ্টই প্রতীয়মান তারা সংঘবদ্ধভাবে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রচার বা অপপ্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কার্যক্রমের লিস্ট করা হলে হোঁচট খেতে হবে। মাঠ-পর্যায় ছাড়াও ডিজিটাল বাংলাদেশের কড়ায়-গণ্ডায় সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ইন্টারনেট জুড়ে তাদের অপপ্রচার চলছে। আমাদের কতজন নেতা আছে যারা যৌক্তিকভাবে এর প্রতি-উত্তর দিয়ে যেতে পারবে? হাতেগোনা কয়েকজন এ প্রচারণায় ভূমিকা রাখছে, তাও বিচ্ছিন্নভাবে। আমারা অদূর ভবিষ্যতে কি আর গাফফার চৌধুরী বা এম.আর.আখতার মুকুলদের মতো মনীষী পাবো যারা আমাদের ছায়া হয়ে শীতলতা দিবেন! পথ প্রদর্শন করবেন!
সবকিছু কি প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হবে?
এ তিন বছরে সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হবার আগে কারও যেন কোন কিছু করার বা বলার নেই। জননেত্রী দৈনিক ১৭/১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। কোথাও ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ হলেও সেটা তাঁকে দেখতে হবে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ আর মাত্র দুই বছর। সকল অঙ্গসংগঠনের যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন প্রয়োজন। দলীয়/সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সরকারী কোন পদে না থাকাটাই দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এখনও যদি দ্রুত আওয়ামী লীগ সহ অঙ্গসংগঠনগুলো কার্যকর করা না যায়, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে জনগণের মাঝে সরকারের সাফল্য তুলে ধরা না যায়, তবে আওয়ামী লীগকেই মূল্য দিতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন আওয়ামী লীগ যেটা প্রচারণা হিসাবে বিবেচনা করবে সেই একই কাজ তথা প্রচার/অপপ্রচার বিএনপি-জামাত করবে মরণ-কামড় দিয়ে।
